জীবিকার সন্ধানে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় প্রতি বছর লাখো বাংলাদেশি পাড়ি জমান বিদেশের মাটিতে। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাব এবং দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকেই সর্বস্বান্ত হন। কাজের জন্য বিদেশ যাওয়া কেবল একটি বিমান যাত্রা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া যা শুরু হয় মানসিক প্রস্তুতি থেকে।
আপনি কি বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? কিংবা পাসপোর্ট হাতে পেয়ে পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে চিন্তিত? তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্যই। একজন দক্ষ ও সচেতন কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে এবং বৈধ পথে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫টি সুনির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করা জরুরি।
আজকের এই গাইডে আমরা আলোচনা করবো বিদেশ যাওয়ার পূর্বের প্রস্তুতি, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে বিএমইটি স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ এবং বিমানবন্দর পার হওয়া পর্যন্ত ১৫টি অত্যাবশ্যকীয় করণীয় সম্পর্কে।
বিদেশ যাওয়ার আগে যে ১৫টি ধাপ আপনাকে মানতেই হবে
সরকার এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের সুরক্ষার জন্য নিচে উল্লেখিত ১৫টি ধাপ অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
১. বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও পাসপোর্ট তৈরি
বিদেশ যাওয়ার প্রথম ধাপ হলো মানসিক প্রস্তুতি এবং বৈধ পথের অনুসন্ধান। অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া মানেই নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা। তাই প্রথমেই দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন যে আপনি কেবল সরকারি নিয়ম মেনে বৈধ পথেই যাবেন।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই আপনার প্রথম কাজ হলো পাসপোর্ট করা। পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ১০ বছর এবং বিদেশ যাওয়ার সময় তার মেয়াদ যেন ন্যূনতম ৬ মাস থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। পাসপোর্টে আপনার নাম, বয়স এবং ঠিকানা জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সাথে হুবহু মিল থাকতে হবে।
২. লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
অনেকে আবেগের বশবর্তী হয়ে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার আগে ঠান্ডা মাথায় লাভ-ক্ষতির হিসাব কষুন।
-
খরচ: ভিসা, বিমান ভাড়া, এজেন্সি ফি, মেডিকেল এবং আনুষাঙ্গিক সব মিলিয়ে মোট কত টাকা খরচ হবে?
- আয়: বিদেশে গিয়ে আপনার মাসিক বেতন কত হবে? সেখান থেকে থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে কত টাকা দেশে পাঠাতে পারবেন?যদি দেখেন যে খরচ উঠাতেই ৩-৪ বছর লেগে যাবে, তবে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন।
৩. জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসে (DEMO) নিবন্ধন
পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর আপনার প্রথম কাজ হলো নিজ জেলার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে (DEMO) গিয়ে নাম নিবন্ধন করা। এটি সরকারি ডাটাবেসে আপনার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার প্রথম ধাপ। এর ফলে আপনি বৈধ কর্মী হিসেবে তালিকাভুক্ত হবেন এবং সরকারিভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ এলে অগ্রাধিকার পাবেন।
৪. গন্তব্য দেশের ভাষার প্রশিক্ষণ গ্রহণ
বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়ার অন্যতম কারণ হলো ভাষা না জানা। আপনি যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের ভাষা জানলে কর্মক্ষেত্রে এবং দৈনন্দিন জীবনে আপনি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশ সরকারের অধীনে সারা দেশে ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (TTC) জাপানি, কোরিয়ান, আরবি, ইংরেজি ও ক্যান্টনিজসহ বিভিন্ন ভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নামমাত্র খরচে এই প্রশিক্ষণ নিয়ে সনদ অর্জন করুন।
৫. দক্ষতা অনুযায়ী কাজের প্রশিক্ষণ গ্রহণ
“দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে, অর্থ সম্মান দুই-ই মেলে।” অদক্ষ শ্রমিকের বেতন দক্ষ শ্রমিকের তুলনায় অনেক কম হয়। তাই বিদেশ যাওয়ার আগে কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা অর্জন করুন।
বর্তমানে দেশের ৬৪টি টিটিসি (TTC) এবং ৬টি আইএমটিতে (IMT) ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, ড্রাইভিং, রেফ্রিজারেশন, হাউসকিপিং, কেয়ারগিভিং ইত্যাদি নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
৬. সরকার অনুমোদিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গমন
প্রতারণা এড়াতে সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিক রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করা। কোনো ব্যক্তি বা “দালাল” আপনাকে বৈধভাবে বিদেশ পাঠাতে পারে না।
এজেন্সির সাথে লেনদেন করার আগে তাদের আরএল (RL) নম্বর (রিক্রুটিং লাইসেন্স নম্বর) যাচাই করুন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (BMET) ওয়েবসাইটে বৈধ এজেন্সির তালিকা পাওয়া যায়।
৭. চুক্তিপত্র ভালোমতো পড়ে ও বুঝে স্বাক্ষর করা
বিদেশ যাওয়ার আগে নিয়োগকারী কোম্পানি বা এজেন্সির সাথে একটি চুক্তিপত্র (Job Contract) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার আগে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত হোন:
-
কোম্পানির নাম ও ঠিকানা।
-
আপনার পদবি ও কাজের ধরন।
-
মাসিক মূল বেতন, ওভারটাইম, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা।
- চুক্তির মেয়াদ ও ছুটির নিয়ম।না পড়ে কখনোই দলিলে সই করবেন না।
৮. কাগজপত্রের ৩ সেট ফটোকপি সংরক্ষণ
বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতির সময় এবং যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আপনার সমস্ত জরুরি কাগজপত্রের অন্তত ৩ সেট ফটোকপি তৈরি করুন।
-
১ম সেট: নিজের সাথে হ্যান্ড লাগেজে রাখুন।
-
২য় সেট: মূল লাগেজে রাখুন।
-
৩য় সেট: বাড়িতে বিশ্বস্ত কারো কাছে রেখে যান।
৯. বিএমইটি (BMET) স্মার্ট কার্ড গ্রহণ
বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণপত্র হলো বিএমইটি ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স কার্ড বা স্মার্ট কার্ড। ভিসা ও টিকিট নিশ্চিত হওয়ার পর নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে এই কার্ড সংগ্রহ করতে হয়। এই কার্ড ছাড়া বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে যাওয়া সম্ভব নয়। এতে আপনার বিমা এবং ডাটাবেস তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
১০. বিদেশ যাওয়ার পূর্বে ব্যাংক হিসাব খোলা
বিদেশ যাওয়ার পূর্বেই নিজের নামে অথবা পরিবারের মনোনীত ব্যক্তির নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলুন। হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা পাঠাবেন না। বৈধ পথে টাকা পাঠালে সরকার বর্তমানে ২.৫% হারে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে এবং এটি আপনার আয়ের বৈধ দলিল হিসেবে কাজ করে।
১১. প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ (PDO) – ৩ দিনের ব্রিফিং
স্মার্ট কার্ড পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো ৩ দিনের প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ বা Pre-Departure Orientation (PDO) সম্পন্ন করা। টিটিসিগুলোতে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানে আপনাকে বিমানবন্দরের নিয়ম, গন্তব্য দেশের আইন-কানুন, এবং বিপদে দূতাবাসের সহায়তা পাওয়ার উপায় সম্পর্কে শেখানো হয়।
১২. ফিঙ্গার প্রিন্ট বা বায়োমেট্রিক নিবন্ধন
ভিসা প্রসেসিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ দেওয়া। আপনার নিজ জেলার ডিইএমও (DEMO) অফিসে গিয়ে ১০ আঙ্গুলের ছাপ এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান করে বিএমইটি ডাটাবেসে সংরক্ষণ করতে হয়।
১৩. অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
বিদেশে যাওয়ার আগে শারীরিক ফিটনেস অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য GAMCA (গামকা) অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হয়। দালালদের প্ররোচনায় ভুয়া ক্লিনিক থেকে কম টাকায় মেডিকেল করাবেন না, এতে রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না।
১৪. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সাহায্য ও সদস্যপদ
বিদেশগামী প্রত্যেক কর্মী বাধ্যতামূলকভাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হন। এটি প্রবাসীদের বিপদে ভরসার জায়গা। বিদেশে মৃত্যু হলে লাশ দেশে আনা, দাফন খরচ, মৃত্যুজনিত অনুদান এবং সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি—এসব সুবিধা এই বোর্ডের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।
১৫. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা
অনেকে বিদেশ যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেন বা চড়া সুদে ঋণ নেন। এই সমস্যা সমাধানে সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। আপনার কাছে যদি বৈধ ভিসা ও কাজের চুক্তিপত্র থাকে, তবে আপনি এই ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে “অভিবাসন ঋণ” নিতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. বিদেশ যাওয়ার জন্য নিবন্ধন কোথায় করতে হয়?
উত্তর: আপনার নিজ জেলার জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসে (DEMO) গিয়ে অথবা ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারেন।
২. বিএমইটি স্মার্ট কার্ড কেন প্রয়োজন?
উত্তর: এটি আপনার বৈধ অভিবাসনের প্রমাণপত্র। ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স এবং বিদেশে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য এটি বাধ্যতামূলক।
৩. বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করতে সরকার কি সাহায্য করে?
উত্তর: হ্যাঁ, বৈধ কাগজ থাকলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন অভিবাসন ঋণ পাওয়া যায়।
শেষ কথা
বিদেশ যাওয়া মানেই সোনার হরিণ হাতে পাওয়া নয়, যদি না আপনি সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে যান। মনে রাখবেন, একজন দক্ষ কর্মীর কদর বিশ্বজুড়ে। তাড়াহুড়ো না করে, দালালদের প্রলোভনে কান না দিয়ে উপরোক্ত ১৫টি ধাপ অনুসরণ করুন। সরকারি নিয়ম মেনে বৈধ পথে বিদেশ গেলে আপনার কর্মজীবন হবে নিরাপদ এবং সম্মানজনক।
আপনার বিদেশ যাত্রা সফল ও সুন্দর হোক।
(তথ্যসূত্র: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিএমইটি)



